This info was collected ডা. মানিক মজুমদার
MBBS, BCS (Health), MD (Pediatrics)
IPPN (Boston, USA) | ENS (Germany)
শিশুকে ঝাঁকুনি দেওয়া: আদর নয়, সবচেয়ে বড় বিপদ
রাত দুটো। বাচ্চা কাঁদছে, থামছে না। আপনি ক্লান্ত। মনে হচ্ছে একটু জোরে ঝাঁকিয়ে দিলেই বুঝি থেমে যাবে।
ওই একটা মুহূর্তই একটা শিশুর গোটা জীবন বদলে দিতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলে Shaken Baby Syndrome (SBS), এখন অনেকে বলেন Abusive Head Trauma। ভেতরে কী হয়, কীভাবে চিনবেন, কখন হাসপাতালে ছুটবেন, আর কীভাবে এটা ঘটতেই দেবেন না, সবটা বলছি।
মাথার ভেতরে কী ঘটে?
নবজাতকের মাথা শরীরের তুলনায় বড় ও ভারী। ঘাড়ের পেশি এত দুর্বল যে মাথা সামলাতে পারে না। মস্তিষ্ক নরম, জেলির মতো।
জোরে ঝাঁকালে মাথা চাবুকের মতো সামনে-পেছনে আছড়ে পড়ে। মস্তিষ্ক খুলির দেয়ালে বারবার ধাক্কা খায়। রক্তনালী ছিঁড়ে যায়, মস্তিষ্ক ফোলে, চোখের রেটিনায় রক্তক্ষরণ হয়।
আর ভয়ের কথাটা হলো, বাইরে থেকে কিছুই দেখা না-ও যেতে পারে। কোনো দাগ নেই, ফোলা নেই, অথচ ভেতরে মারাত্মক ক্ষতি।
কখন বেশি হয়?
জন্মের ২ সপ্তাহ থেকে ৬ মাস বয়সে, সবচেয়ে বেশি ২–৪ মাসে। কারণ এই সময়টাতেই শিশু সবচেয়ে বেশি কাঁদে। ৬–৮ সপ্তাহে কান্না চূড়ায় ওঠে, বিকেল-সন্ধ্যায় আরও বেশি। এটা স্বাভাবিক, ধীরে ধীরে কমে যায়।
কিন্তু ঘুমহীন রাতে এই কান্না অসহ্য লাগে। ঝাঁকুনি প্রায় সবসময় আসে রাগ বা অসহায়তা থেকে। বাবা-মা, দাদি-নানি, সহায়িকা, বাসার যে-কেউ হতে পারেন।
কোনটা বিপদ, কোনটা নয়?
ভয়ে বাচ্চাকে কোলে নেওয়া ছাড়বেন না। এগুলো নিরাপদ:
• কোলে নিয়ে আস্তে দোলানো
• হাঁটুতে বসিয়ে আলতো তালে নাচানো
• পিঠে হালকা চাপড় দিয়ে ঢেকুর তোলানো
বিপদ হলো জোরে, বারবার ঝাঁকানো। শিশুকে শূন্যে ছুড়ে লোফালুফিও নয়। হাত ফসকালে মেঝেতে পড়বে, ঘাড় সামলাতে পারবে না।
আমার চেম্বারে প্রায়ই দেখি, কাঁদলে কেউ কাঁধে ফেলে জোরে দুলিয়ে ঘুম পাড়ান। কেউ নিস্তেজ বাচ্চাকে ঝাঁকিয়ে “জাগানোর” চেষ্টা করেন। বিষম খেলে পিঠে ঝাঁকুনি দেন। মমতা থেকেই আসে, তবু ক্ষতিকর। এখনই বন্ধ করুন।
SBS-এর লক্ষণ
সূক্ষ্ম লক্ষণ (সহজে চোখ এড়িয়ে যায়):
• অস্বাভাবিক খিটখিটে ভাব, একটানা কান্না
• অতিরিক্ত ঘুম, ডাকলেও সহজে জাগে না
• পেটের অসুখ ছাড়াই বারবার বমি
• দুধ খেতে না চাওয়া
• আগের মতো হাসছে না, তাকাচ্ছে না
• হাত-বাহু বা বুকের পাশে আঙুলের ছাপের মতো কালশিটে
গুরুতর লক্ষণ (এক মিনিটও দেরি নয়):
• খিঁচুনি
• শ্বাসকষ্ট, শ্বাস থেমে যাওয়া, ঠোঁট বা মুখ নীলচে
• নেতিয়ে পড়া, সাড়া না দেওয়া, অজ্ঞান ভাব
• মাথার তালু (ফন্টানেল) ফুলে ওঠা
• চোখ স্থির, দুই মণি অসমান, চোখে রক্ত
• এক পাশের হাত-পা কম নাড়ানো
এখনই হাসপাতালে যান যদি…
ঝাঁকুনির পর বা সন্দেহ হলে উপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা যায়। শিশু অচেতন বা শ্বাসকষ্টে থাকলে ৯৯৯-এ কল করুন বা নিকটস্থ জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
তিন মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর ১০০.৪°F (৩৮°C) বা বেশি হলেও দেরি নয়।
ঝাড়ফুঁক, কবিরাজ বা টোটকায় সময় নষ্ট করবেন না। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে প্রতিটা ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ। মফস্বলে থাকলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা হাসপাতালে যান, প্রয়োজনে সেখান থেকে রেফার করবে।
আর যদি ভুল করেই ফেলেন?
সত্যিটা লুকাবেন না। কঠিন, আমি জানি। কিন্তু ঘটনা না জানলে ডাক্তার ঠিক চিকিৎসা শুরু করতে পারেন না। আপনার ভয়ের দাম শিশুকে দিতে হবে। ডাক্তারের প্রথম কাজ শিশুকে বাঁচানো।
কান্না থামছে না? তাহলে
১. আগে কারণ খুঁজুন: খিদে, ভেজা কাপড়, গরম-ঠান্ডা, গ্যাস, টাইট জামা, আঙুল বা পায়ে সুতো-চুলের পাঁচ, জ্বর। সব ঠিক থাকলে কান্নাটাই স্বাভাবিক।
২. গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে আস্তে হাঁটুন, নিচু স্বরে গুনগুন করুন।
৩. নিজে ভেঙে পড়ছেন মনে হলে শিশুকে নিরাপদে চিত করে শুইয়ে দিন। পাশের ঘরে গিয়ে ১০ মিনিট দাঁড়ান, গভীর শ্বাস নিন। বাচ্চা কিছুক্ষণ কাঁদলে কিছু হবে না। ঝাঁকুনি খেলে হবে।
৪. কাউকে ডাকুন। “একটু ধরো” বলাটা দুর্বলতা নয়।
৫. মা যদি দিনের পর দিন খুব বিষণ্ণ, রাগী বা অসহায় বোধ করেন, ডাক্তারকে বলুন। প্রসব-পরবর্তী মানসিক চাপ চিকিৎসাযোগ্য।
বাড়ির সবাইকে বলুন
ঝাঁকুনির আঘাত হলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও হতে পারে: দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, খিঁচুনির রোগ, পক্ষাঘাত বা সেরিব্রাল পালসি, শেখায় দেরি, আচরণগত সমস্যা। গুরুতর ক্ষেত্রে শিশু বাঁচেও না।
যে-ই শিশুকে কোলে নেয়, তাকে জানতে হবে: সহায়িকা, দাদি-নানি, চাচা-মামা, বড় ভাইবোন। ছোট ভাইবোনকে কখনো একা শিশুর দায়িত্ব দেবেন না। সহায়িকাকে প্রথম দিনই বলে দিন: “বাচ্চা কাঁদলে ঝাঁকাবেন না। সামলাতে না পারলে আমাকে ফোন করবেন।”
শেষ কথা। কান্নারত শিশুকে কোলে নিয়ে হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করাটা অপরাধ নয়। অনেক ভালো বাবা-মায়েরই এমন মনে হয়। অপরাধ হয় যখন সেই ইচ্ছা হাতে চলে আসে। তাই হাত থামান, শিশুকে শুইয়ে দিন, একটু সরে দাঁড়ান।
তথ্যটি অন্য মা-বাবাদের সঙ্গে শেয়ার করুন। আপনার একটা শেয়ার একটা শিশুকে বাঁচাতে পারে।
Md.Rafiqul Islam Lipu,Date:-23-09-2026 Wednesday,Time:-2-38-47 Pm