Image attached:-

রাত ৩টা। বাচ্চা কাঁদছে। কিছুতেই থামছে না।
আর আপনি মনে মনে নিজেকেই দোষ দিচ্ছেন: “আমি কি ভালো মা হতে পারলাম না?”
প্রায় প্রতিদিন চেম্বারে এই প্রশ্নটা শুনি। চোখের নিচে কালি, কোলে ছোট্ট শিশু, আর মায়ের গলায় অপরাধবোধ।
উত্তরটা সোজা বলে দিই: না। কান্না আপনার ব্যর্থতা নয়। কান্না আপনার সন্তানের প্রথম ভাষা।
সুস্থ নবজাতকও দিনে ১–৩ ঘণ্টা কাঁদতে পারে। ২ সপ্তাহ থেকে কান্না বাড়ে, ৬ সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি, ৩–৪ মাসে কমে আসে। কান্না মানেই রোগ নয়। তবে কিছু কান্না ফেলে রাখা যায় না, সেটা নিচে আছে।
কেন কাঁদে? আর আপনি কী করবেন
১️⃣ খিদে: সবচেয়ে বড় কারণ। কান্না শুরুর আগেই দেখুন ঠোঁট চাটা, মুখের কাছে হাত নেওয়া, বুক খোঁজা। ২৪ ঘণ্টায় ৮–১২ বার বুকের দুধ দিন। ৬ মাস পর্যন্ত পানি, মধু, গ্রাইপ ওয়াটার কিছুই নয়।
২️⃣ গ্যাস ও কোলিক: প্রতি খাওয়ার পর কাঁধে তুলে ঢেকুর তোলান। পা সাইকেলের মতো নাড়ান, নাভির চারপাশে ঘড়ির কাঁটার দিকে হালকা ম্যাসাজ করুন। কোলিক মানে সুস্থ শিশুর দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি, সপ্তাহে ৩ দিনের বেশি, টানা ৩ সপ্তাহের বেশি কান্না। ৩–৪ মাসে নিজে থেকেই থেমে যায়।
৩️⃣ পেটের অস্বস্তি: একটু দুধ তুলে ফেলা স্বাভাবিক, যদি শিশু হাসিখুশি থাকে আর ওজন বাড়ে। খাওয়ার পর ২০–৩০ মিনিট খাড়া করে কোলে রাখুন।
৪️⃣ ঘুম ও ক্লান্তি: নবজাতক ১ ঘণ্টার বেশি একটানা জেগে থাকতে পারে না। চোখ কচলানো আর হাই তোলা দেখলেই ঘুমের ব্যবস্থা করুন। বেশি ক্লান্ত হলে ঘুমাতেও পারে না, তখন কান্না আরও বাড়ে।
৫️⃣ বেশি আলো-শব্দ-মানুষ: টিভি, ফ্ল্যাশ, হাতে হাতে ঘোরা আদর, সবটাই ওর কাছে বেশি। আলো কমিয়ে শান্ত ঘরে বুকে নিয়ে বসুন। অতিথি সামলানো মায়ের কাজ নয়, পরিবারের বাকিরা দেখুন।
৬️⃣ গরম-ঠান্ডা: গরমকালেও কাঁথা, মোজা, টুপি একসাথে? এটা আমাদের দেশের বড় ভুল। নিজে যা পরেন, তার চেয়ে মাত্র এক স্তর বেশি পরান। ঠান্ডা-গরম বুঝতে বুক বা ঘাড়ের পেছনে হাত দিন। হাত-পা একটু ঠান্ডা থাকাই স্বাভাবিক। আঙুলে চুল বা সুতো পেঁচিয়ে গেছে কি না দেখুন, এটা প্রায়ই মিস হয়।
৭️⃣ কোলের দরকার: “বেশি কোলে নিলে অভ্যাস খারাপ হবে”? ভুলে যান। নবজাতককে আদর দিয়ে নষ্ট করা যায় না। ত্বকে-ত্বকে কোলে নিন, বাবাও পারেন। আস্তে দোলান, “শ্শ্শ্” করুন।
৮️⃣ অসুস্থতা বা ব্যথা: জ্বর, সংক্রমণ, নাভির ইনফেকশন, হার্নিয়া, শ্বাসকষ্ট, কানের ব্যথা, সবই কান্না দিয়ে শুরু হতে পারে। নিচের লাল পতাকাগুলো মিলিয়ে নিন।
৯️⃣ কোনো কারণ ছাড়াই: সব দেখলেন, তবু কাঁদছে? শিশু সুস্থ, খাচ্ছে, ভেজা ডায়াপার আছে, ওজন বাড়ছে, তাহলে এটাও স্বাভাবিক।
যা করবেন না
গ্রাইপ ওয়াটার, মধু, কাজল, নিজে থেকে প্যারাসিটামল বা পেটের সিরাপ। তাবিজ-ঝাড়ফুঁকে দিন নষ্ট নয়, আমি এমন শিশু দেখেছি যাদের আনতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।
আর কখনো, কোনো অবস্থাতেই শিশুকে ঝাঁকাবেন না। ধৈর্য শেষ হয়ে এলে শিশুকে নিরাপদে বিছানায় শুইয়ে পাশের ঘরে যান, ১০টা লম্বা শ্বাস নিন, কাউকে ডাকুন। ২ মিনিট কাঁদলে কিছু হয় না।
এই লক্ষণ দেখলে অপেক্ষা নয়, এখনই শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান
৩ মাসের কম শিশুর জ্বর ৩৮°C (১০০.৪°F) বা তার বেশি, অথবা গা অস্বাভাবিক ঠান্ডা
শ্বাস দ্রুত (শান্ত অবস্থায় মিনিটে ৬০-এর বেশি), বুক দেবে যাওয়া, ঠোঁট নীলচে
দুধ খেতে না পারা
অস্বাভাবিক নিস্তেজ, ডাকলে সাড়া নেই
ফিনকি দিয়ে বা সবুজ বমি, পায়খানায় রক্ত
খিঁচুনি, শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া, তালু ফুলে ওঠা
জন্ডিস বাড়ছে আর ঝিমুনি
৫ দিন বয়সের পর ২৪ ঘণ্টায় ৬টির কম ভেজা ডায়াপার
নাভি লাল বা পুঁজ, কুঁচকি বা অণ্ডকোষ ফোলা
ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা তীক্ষ্ণ কান্না
একটা কথা মনে রাখবেন। শিশু হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে, খাচ্ছে না, শুধু ঝিমাচ্ছে? এটা “শান্ত বাচ্চা” নয়। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক লক্ষণগুলোর একটা।
চেম্বারে আসার আগে কান্না আর শ্বাসের ৩০ সেকেন্ডের একটা ভিডিও তুলে রাখুন। ডাক্তারের সামনে এলে অনেক বাচ্চা ঠিক তখনই চুপ হয়ে যায়।
মনে রাখবেন
বেশির ভাগ কান্নাই স্বাভাবিক। আগে দেখুন: খিদে, ঢেকুর, ডায়াপার, তাপমাত্রা, কোল।
জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খেতে না পারা, নিস্তেজ হয়ে যাওয়া দেখলে দেরি নয়।
কোনো ওষুধ বা টোটকা নয়।
মায়ের মন টানা ২ সপ্তাহের বেশি খারাপ থাকলে সেটা লুকাবেন না, সাহায্য নিন। বাবারা, রাতের শিফটে হাত লাগান।
শিশুর কান্না শুনুন, বুঝুন, পাশে থাকুন।
Md.Rafiqul Islam Lipu,Date:-23-09-2026 Wednesday,Time:-2-38-47 Pm