সুস্থ বাচ্চার হঠাৎ শ্বাসকষ্ট: জেনে নিন সম্ভাব্য কারণ ও তাৎক্ষণিক করণীয়:
একটি একদম সুস্থ-সবল শিশু হঠাৎ করেই যদি হাঁসফাঁস করতে থাকে বা শ্বাসকষ্টে ভোগে, তবে যেকোনো বাবা-মায়ের জন্যই তা প্রচণ্ড দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের হঠাৎ শ্বাসকষ্টকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয়।
হঠাৎ শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণসমূহ:
১. ফরেন বডি অ্যাসপিরেশন (শ্বাসনালীতে খাবার বা জিনিসপত্র আটকে যাওয়া): ছোট শিশুরা কৌতূহলবশত মুখে খেলনা, বিচি, কয়েন, বাদাম বা ছোটখাটো জিনিস দিয়ে ফেলে। এগুলো যদি ভুল করে শ্বাসনালীতে ঢুকে যায়, তবে মুহূর্তের মধ্যেই শ্বাসপথ বন্ধ হয়ে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও কাশি শুরু হতে পারে।
২. অ্যাজমা বা হাপানির প্রথম অ্যাটাক (Acute Asthma Attack): অনেক শিশুর মধ্যে হাঁপানি বা অ্যাজমার প্রবণতা থাকে যা আগে হয়তো প্রকাশিত হয়নি। ধুলাবালি, ধোঁয়া, ঠান্ডা বাতাস বা কোনো অ্যালার্জেন-এর সংস্পর্শে এলে হঠাৎ করেই শ্বাসনালী সংকীর্ণ হয়ে তীব্র শ্বাসকষ্ট বা বাঁশির মতো শব্দ (Wheezing) হতে পারে।
৩. ক্রুপ (Croup) বা শ্বাসনালীর সংক্রমণ: এটি সাধারণত ভাইরাসজনিত ইনফেকশনের কারণে হয়। এতে শিশুর শ্বাসনালী এবং স্বরযন্ত্র ফুলে যায়। এর মূল লক্ষণ হলো—হঠাৎ কুকুর ডাকার মতো কাশি (Barking cough), গলার আওয়াজ ভেঙে যাওয়া এবং শ্বাস নেওয়ার সময় বুক দেবে যাওয়া।
৪. তীব্র অ্যালার্জি (Anaphylaxis): কোনো নির্দিষ্ট খাবার (যেমন: বাদাম, ডিম, চিংড়ি), পোকামাকড়ের কামড় বা ওষুধের কারণে তীব্র অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হতে পারে। এতে মুখের ভেতরের অংশ বা শ্বাসনালী ফুলে উঠে দ্রুত শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
৫. নিউমোনিয়া বা তীব্র ব্রঙ্কিওলাইটিস (Pneumonia / Bronchiolitis): ফুসফুস বা শ্বাসনালীর নিম্নাংশের ভাইরাসবাহিত ইনফেকশনে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া, বুকের পাঁজর দেবে যাওয়া এবং জ্বরের সাথে সাথে শ্বাসকষ্টের সূচনা হতে পারে।
শ্বাসনালীতে কিছু আটকে গেলে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা: “হেমলিক মেনুভার” (Heimlich Maneuver)
শ্বাসনালীতে কোনো বস্তু আটকে শিশু শ্বাস নিতে না পারলে বা কাশত না পারলে দ্রুত হেমলিক মেনুভার প্রয়োগ করতে হবে।
শিশুর বয়সের ওপর ভিত্তি করে এই পদ্ধতিটি দুইভাবে দিতে হয়:
১ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে (Back Blows & Chest Thrusts):
উপুর করে ধরুন: শিশুকে আপনার এক হাতের ওপর পেট নিচের দিকে দিয়ে থুতনি ধরে রাখুন (মাথা যেন শরীরের চেয়ে কিছুটা নিচু থাকে)।
পিঠে থাপ্পড় দিন (Back Blows): অপর হাতের তালুর নিচের অংশ দিয়ে শিশুর দুই পিঠের হাড়ের মাঝখানে ৫ বার হালকা কিন্তু শক্তভাবে ধাক্কা দিন।
বুকের চাপ (Chest Thrusts): কাজ না হলে শিশুকে চিত করে ঘুরিয়ে বুকের মাঝখানে (স্তনের বোঁটার ঠিক নিচে) দুই আঙুল দিয়ে ৫ বার চাপ দিন।
আটকে থাকা জিনিস বের না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটি পর পর চালিয়ে যান।
১ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে (Abdominal Thrusts):
পেছন থেকে জড়িয়ে ধরুন: শিশুর পেছনে হাঁটু গেড়ে বসুন এবং আপনার দুই হাত শিশুর কোমর দিয়ে পেঁচিয়ে আনুন।
মুষ্টি তৈরি করুন: এক হাতের মুষ্টি (Fist) তৈরি করে শিশুর নাভির ঠিক ওপরে এবং বুকের খাঁচার নিচে রাখুন।
ওপর ও ভেতরের দিকে চাপ দিন: অপর হাত দিয়ে সেই মুষ্টি চেপে ধরে দ্রুত ওপর ও ভেতরের দিকে (Upward and Inward) ধাক্কা দিন।
বস্তুটি বের না হওয়া পর্যন্ত বা শিশু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নেওয়া পর্যন্ত এভাবে চাপ দিতে থাকুন।
কখন বুঝবেন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক?
শিশু যদি কথা বলতে বা কান্নাকাটি করতে কষ্ট পায়।
শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের পাঁজর বা পেট ভেতরের দিকে মারাত্মকভাবে দেবে গেলে।
ঠোঁট, মুখমণ্ডল বা হাতের নখ নীলচে হয়ে গেলে।
শিশু অতিরিক্ত নিস্তেজ বা ঢুলুঢুলু হয়ে পড়লে।
বাবা-মায়ের জন্য তাৎক্ষণিক করণীয়
শান্ত থাকুন: নিজে আতঙ্কিত না হয়ে শিশুকে কোলে নিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। কান্নাকাটি করলে শ্বাসকষ্ট আরও বাড়ে।
শ্বাসনালীতে কিছু আটকে গেলে: শিশু কাশি দিলে তাকে কাশতে দিন। তবে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে মুখে আঙুল দিয়ে কিছু বের করার চেষ্টা করবেন না, এতে বস্তুটি আরও ভেতরে ঢুকে যেতে পারে।
সোজা করে বসিয়ে রাখুন: শিশুকে শুইয়ে না রেখে সোজা করে বসিয়ে রাখুন বা বুকে জড়িয়ে ধরে রাখুন।
দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান: অনতিবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ (Emergency Department) বা নাক-কান-গলা (ENT) / শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান। Md.Rafiqul Islam Lipu,Date:-23-09-2026 Wednesday,Time:-2-38-47 Pm