This info is collected by ডা. মানিক মজুমদার:-
MBBS, BCS (Health), MD (Pediatrics)
IPPN (Boston, USA) | ENS (Germany)
রাত দুপুরে ঘুমন্ত শিশু হঠাৎ কেঁদে উঠল, “আম্মু, পা ব্যথা!” অথচ সকালে উঠে দিব্যি দৌড়াদৌড়ি। এটা কি রোগ? নাকি চিন্তার কিছু নেই?
চেম্বারে প্রায়ই এমন বাবা-মা আসেন। বেশিরভাগই প্রথমবার সন্তানের মা-বাবা, চোখেমুখে দুশ্চিন্তা। আজ খোলাখুলি বলব। ভয় পাওয়ার আগে জানুন, অবহেলা করার আগেও জানুন।
গ্রোথ পেইন কী?
শিশুর পায়ের মাংসপেশির রাতের ব্যথা। বয়স ৩ থেকে ১২ বছর, বিশেষ করে ৩–৫ এবং ৮–১২ বছরে বেশি দেখা যায়। ব্যথা হয় উরুর সামনে, পায়ের ডিমে বা হাঁটুর পেছনে। সাধারণত দুই পায়েই। বিকেল-সন্ধ্যা থেকে শুরু, রাতে ঘুম ভেঙে যায়, সকালে সব স্বাভাবিক।
নামে “গ্রোথ” থাকলেও হাড় লম্বা হওয়ার সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত নয়। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে পেশির ক্লান্তিকেই মূলত সন্দেহ করা হয়।
হাত বা বাহুতে ব্যথা? গ্রোথ পেইন প্রায় সবসময় পায়ে হয়। শুধু হাতে, একটা হাতেই, অথবা হাতের জয়েন্ট ফুলে গেলে “গ্রোথ পেইন” ধরে নিয়ে বসে থাকবেন না। ডাক্তার দেখান।
ঘরে এখন কী করবেন?
আলতো মালিশ, ৫–১০ মিনিট। জোরে চাপ বা টানাটানি নয়।
কুসুম গরম সেঁক, অবশ্যই কাপড়ে মুড়িয়ে। শিশু ঘুমিয়ে পড়লে সরিয়ে নিন। গরম পানির ব্যাগে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ঘটনা আমি দেখেছি।
ঘুমের আগে কুসুম গরম পানিতে গোসল।
দিনে খেলার ছলে হালকা স্ট্রেচিং।
কোলে নিন, পাশে বসুন। মা-বাবার স্পর্শ নিজেই অর্ধেক ওষুধ। স্কুলের চাপ বা নতুন ভাইবোনের কারণেও ব্যথা বাড়তে পারে।
ব্যথা খুব বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যায়। বড়দের ট্যাবলেট ভেঙে নয়। প্রতিদিনই ওষুধ লাগছে? থামুন, ডাক্তার দেখান।
পুষ্টি ও বিকাশ: প্রতিদিন দুধ, ডিম, মাছ (ছোট মাছ কাঁটাসহ), ডাল, শাক, ফল। সকালের রোদে ১৫–২০ মিনিট খেলা, কারণ আমাদের দেশে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি অনেক। দৌড়ঝাঁপ বন্ধ করবেন না, আরামদায়ক জুতা পরান। ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি নিজে থেকে কিনে খাওয়াবেন না, ডাক্তার পরীক্ষা করে ঠিক করবেন।
যা করবেন না
“ও ঢং করছে” বলবেন না। ব্যথা সত্যি।
ফার্মেসির ইনজেকশন, স্টেরয়েড নয়। কবিরাজি তেল বা ঝাড়ফুঁকে সময় নষ্ট নয়।
কারণ নিশ্চিত না হয়ে কোনো ওষুধ শুরু নয়, হোমিওপ্যাথিসহ। হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতার ভালো মানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি সময়ের। “গ্রোথ পেইন” ভেবে মাসের পর মাস কাটালে গুরুতর অসুখ দেরিতে ধরা পড়ে।
রেড ফ্ল্যাগ: এর একটাও দেখলে দেরি নয়
খুঁড়িয়ে হাঁটা, বা পায়ে ভর দিতে না চাওয়া
দিনের বেলাতেও ব্যথা, প্রতিদিন, ক্রমে বাড়ছে
শুধু একটা পা বা হাতে, সবসময় একই জায়গায়
জয়েন্ট ফোলা, লাল, গরম
জ্বর, ওজন কমা, রাতে ঘামে ভেজা, খাওয়ায় অরুচি
ফ্যাকাশে ভাব, সহজে কালশিটে, নাক-মাড়ি দিয়ে রক্ত
সকালে জয়েন্ট শক্ত, র্যাশ
গলা ব্যথার কয়েক সপ্তাহ পর এক জয়েন্ট থেকে আরেক জয়েন্টে ব্যথা
আঘাতের পর ব্যথা, পিঠে ব্যথা, বারবার পড়ে যাওয়া, সিঁড়ি বাইতে দুর্বলতা
৩ বছরের কম বয়সী শিশুর পায়ে ব্যথা
ব্যথায় ঘুমাতেই পারছে না, বা সকালেও থাকছে
কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
জয়েন্ট বা হাড়ের সংক্রমণ: ২৪–৪৮ ঘণ্টায় চিকিৎসা না হলে জয়েন্ট স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে।
রক্তের ক্যান্সার (লিউকেমিয়া): হাড়-জয়েন্টের ব্যথা এর প্রথম লক্ষণ হতে পারে। তাড়াতাড়ি ধরা পড়লে ফল ভালো।
রিউম্যাটিক ফিভার: গলা ব্যথার পর জয়েন্টে ব্যথা। হৃদপিণ্ডের ভাল্বের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। আমাদের দেশে এখনো বাস্তব সমস্যা।
জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস: দেরি হলে জয়েন্ট বেঁকে যায়।
রিকেটস বা তীব্র ভিটামিন ডি-র ঘাটতি: হাড় নরম হয়, পা বাঁকা হয়।
হিপ জয়েন্টের সমস্যা: ব্যথা হাঁটুতে অনুভূত হয়, আসল সমস্যা কোমরে। খোঁড়ানো থাকলে হিপ পরীক্ষা জরুরি।
মনে রাখবেন, গ্রোথ পেইন একটা “বাদ দেওয়ার পর” ডায়াগনোসিস। ডাক্তার পরীক্ষা করে, প্রয়োজনে রক্ত বা এক্স-রে করে অন্য কিছু নেই নিশ্চিত হলে তবেই বলা যায় এটা গ্রোথ পেইন। অনলাইনে পড়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া চলবে না।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে লিখে রাখুন: ব্যথা কোথায়, কখন, কতদিন ধরে, কোন পা, সাথে জ্বর বা ওজন কমা আছে কি না, সম্প্রতি গলা ব্যথা বা আঘাত, আর কী ওষুধ দিয়েছেন। মফস্বলে থাকলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগে দেখান। রেড ফ্ল্যাগ থাকলে সেদিনই।
গ্রোথ পেইন ক্ষতিকর নয়, সময়ের সাথে নিজে সেরে যায়। কিন্তু খোঁড়ানো, জ্বর, ফোলা, সারাদিনের ব্যথা, এই চারটাকে কখনো “ও কিছু না” বলে উড়িয়ে দেবেন না। সন্দেহ হলে দেখানোটাই ভালো। বাবা-মায়ের মন যা বলছে, সেটা গুরুত্ব দিন।
পোস্টটা শেয়ার করুন। কোনো নতুন মা-বাবার রাতের দুশ্চিন্তা হয়তো একটু কমবে।
Md.Rafiqul Islam Lipu,Date:-23-09-2026 Wednesday,Time:-2-38-47 Pm