১.
অনেক হাই ব্লাড প্রেশারের রোগীর ব্লাড প্রেশার খুব বেশি বাড়তি থাকে না, শারীরিকভাবে তেমন অসুবিধাও বোধ করেন না। তারা অনেকক্ষেত্রেই ওষুধ খেতে চান না। ভালোই তো আছি, কেন ওষুধ খাব? তাদের বোঝাতে হয়, হাই প্রেশার একটি অদৃশ্য শত্রু।
কারও যদি ৪০ বছর বয়সে এটি ধরা পড়ে আর সে যদি ৭৪ বছর বাঁচে, তাহলে আগামী ৩৪ বছর তাকে এই শত্রুর সঙ্গে বসবাস করতে হবে। এটা একদিনে বড়ো ধরনের ক্ষতি করে ফেলে না।
তবে বছরের পর বছর যখন এটি বেশি থাকে, তখন একটু একটু করে শরীরের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সীমাহীন ড্যামেজ করে। চিকিৎসা মূলত সেই ভয়াবহ ড্যামেজগুলো থেকে বাঁচানোর জন্য।
২.
শুধু ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে এনে স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪০-৬০%, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ২৫% এবং হার্ট ফেইলিওরের ঝুঁকি ৫০% কমানো সম্ভব।
তাছাড়া কিডনি ফেইলিওর ও চোখের রেটিনা ড্যামেজের সম্ভাবনা সিগনিফিক্যান্টলি কমে আসবে।
শুধু এই একটি রিস্ক ফ্যাক্টর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এতোগুলো মরণঘাতী অসুখের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে আনা যায়। ভাবার বিষয়।
৩.
ব্লাড প্রেশারের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেসের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। স্ট্রেস একটা কিলার। একজন অধ্যাপক আগে একটি ওষুধ খেয়েই ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখতেন, পরে তিনি একটা প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হলেন। মানসিক চাপ অনেক বেড়ে গেলো।
তখন দেখা গেলো, দুটো ওষুধেও তার ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণ হয় না। তিনটি ওষুধ লাগলো তার ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে আনতে।
পরে তার এই গুরুদায়িত্ব যখন সমাপ্ত হলো, তখন দেখা গেলো তিনটি ওষুধে তার ব্লাড প্রেশার অনেক কমে যাচ্ছে। আবার তার একটি ওষুধেই নিয়ন্ত্রণে আসছে। স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে আনা হাইপারটেনশানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা।
৪.
যাদের ব্লাড প্রেশার দীর্ঘদিন ধরে অনেক বেশি থাকে, তাদের যদি হাইপারটেন্সিভ ইমার্জেন্সি না থাকে, তবে প্রেশার একবারে অনেক না কমিয়ে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা ভালো।
এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে মিন আর্টারিয়াল প্রেশার সাধারণত হাই লেভেলে সেট আপ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ড্রামাটিক্যালি প্রেশার কমিয়ে ফেললে বিশেষ করে তার ব্রেইনে ব্লাড সাপ্লাই কমে যায়। এমনকি স্ট্রোকের সম্ভাবনাও থাকে।
৫.
রোগীকে বলে দেওয়া যেতে পারে, আমরা প্রেশারের ওষুধ শুরু করার পর আপনার কিছুদিন শরীর খারাপ লাগতে পারে, মাথা ঘুরাতে পারে। এই সময়টিতে একটু সাবধানে থাকবেন।
আপনার শরীর যেহেতু বেশি প্রেশারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাই এখন প্রেশার যখন আমরা কমাব আপনার শরীর কিছুটা খারাপ লাগবে।তবে কিছুদিন পর এডজাস্ট হয়ে যাবে।
যদি খুব বেশি খারাপ লাগে তাহলে এই দুটো ওষুধের মধ্যে এটির ডোজ এতোটুকু কমিয়ে নিয়েন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
৬.
একটি শব্দহীন কক্ষে ব্যক্তিকে ৫ মিনিট রেস্টে রেখে, হাতের নিচে সাপোর্ট রেখে ব্লাড প্রেশার মাপতে হবে। কাফটি থাকবে পেশেন্টের হার্টের লেভেলে। পিঠ চেয়ারে লাগানো থাকবে। পা ফ্লোরে টাচ করা থাকবে, পায়ের ওপর পা থাকবে না।
প্রস্রাবের চাপ থাকা অবস্থায় প্রেশার না মাপা শ্রেয়।
মাপার সময় অথবা দুবার মাপার মধ্যবর্তী সময়ে কথা বলা যাবে না। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রেশার ১০ মিলিমিটার মার্কারি বেশি দেখাতে পারে। একটি নীরব কক্ষে মাপতে হবে।
ব্লাড প্রেশার মাপার ৩০ মিনিট আগ পর্যন্ত ধূমপান, চা-কফি, খাবার, ব্যায়াম থেকে বিরত থাকতে হবে।
আদর্শ নিয়ম হচ্ছে ১-২ মিনিট বিরতিতে পরপর তিন বার ব্লাড প্রেশার মাপা। তারপর শেষ দুবারে যে প্রেশার পাওয়া গেছে তার গড় করতে হবে। সেই গড়টিই তার ব্লাড প্রেশার।
৭.
ওজন কমাতে পারলে ব্লাড প্রেশারও কমানো সম্ভব। বলা হচ্ছে, ৫ কেজি ওজন কমলে সিস্টোলিক ৪.৪ এবং ডায়াস্টোলিক বিপি ৩.৬ মিমি মার্কারি কমে আসে।
৮.
নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা, শারীরিক পরিশ্রম করা–হাইপারটেনশান নিয়ন্ত্রণে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন।
এমনভাবে হাঁটা উচিত যেন শরীর থেকে ঘাম ঝরে। যাদের কখনোই হাঁটাহাঁটির অভ্যেস নেই তারা প্রথমে দিকে কম গতিতে হাঁটা শুরু করতে পারে। ধীরে ধীরে তারা হাঁটার গতি বাড়াতে পারে।
কম দূরত্বের পথে গাড়ি বা রিকশা দিয়ে না যাতায়াত করে, হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানো ভালো অভ্যেস হতে পারে। ৪/৫ তলায় বাসা হলে লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে ওঠা যেতে পারে।
৯.
যারা ধূমপান করে তাদের হাইপারটেনশান হওয়ার সম্ভাবনা অত্যধিক। শুধু সিগারেটই নয় জর্দা, সাদাপাতা এগুলোও তামাকজাতীয় পদার্থ এবং এদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ রিস্ক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
হাইপারটেনশান ম্যানেজমেন্টে সিগারেট, জর্দা, সাদাপাতা এগুলো পরিহার করার ব্যাপারে ভীষণ গুরুত্বারোপ করতে হবে। যতোবার হাইপারটেনসিভ রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন, প্রতিবারই ধূমপানের বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে, ধূমপান ছেড়েছে কি-না বা সাময়িক ছেড়ে আবার শুরু করেছে কি-না এসব বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণ হয়ে গেলেই আবার ধূমপান বা জর্দা খাওয়া যাবে এমনটি কখনোই ভাবা যাবে না। রোগীর জানা প্রয়োজন, ধূমপান চালিয়ে গেলে হাইপারটেনশানের জন্য যে ওষুধগুলো দেওয়া হচ্ছে তার সুফল পাওয়া যাবে না।
হাইপারটেনশানের রোগীদের মদ্যপান পরিহার করা শ্রেয়।
১০.
ক্রনিক ডিজিজে আক্রান্ত বা যেসব রোগ ভালো হয় না নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় সেসব রোগের রোগীদের একটি কমন সমস্যা হলো কিছুদিন ওষুধ খেয়ে ওষুধ ছেড়ে দেওয়া। প্রতিদিন নিয়ম করে দীর্ঘদিন ওষুধ খেয়ে যাবার মতো মোটিভেশান ধরে রাখা একেবারেই সহজ নয়। তাদের জন্য কয়েকটি কথা–
রোগ হওয়াটা জীবনের অংশ। ওষুধ খাওয়াটাও জীবনের অংশ। এই রোগ-শোক-ওষুধ নিয়েই পূর্ণাঙ্গ আমরা। রোগ-শোক-ওষুধ ছাড়া আমরা পূর্ণাঙ্গ মানুষ নই। ওষুধ খেলে পরে আমরা রোগী নই, আমরা শুধু মানুষ।
ওষুধ আমাদের জন্য অভিশাপ নয়, আমাদের জন্য আশীর্বাদ। প্রেশারের ওষুধ বন্ধ করে দিলে স্ট্রোক, হার্ট এটাক, হার্ট ফেইলিওর, কিডনি ড্যামেজ, চোখের রেটিনা ড্যামেজসহ নানা ভয়ঙ্কর অসুবিধা হতে পারে। তাই ভালো বোধ করলেও, ওষুধ কিনতে কিছুটা অসুবিধা হলেও ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে।
এটা ভবিষ্যতের জন্য ইনভেস্টমেন্ট। আজকে প্রেশারের ওষুধ খেতে হবে ১৫-২০ বছর পরে সুস্থ থাকার জন্য।
……
আজ ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশান ডে। এবারের থিম হচ্ছে, Measure Your Blood Pressure Accurately, Control it, Live Longer.
অর্থাৎ আপনার ব্লাড প্রেশার সঠিকভাবে মাপুন, নিয়ন্ত্রণ করুন, দীর্ঘদিন বাঁচুন।
Raiyyan Tahsan. Date:- 21-05-2025 Wednesday Time:- 04-22-34 Pm