স্ট্রোকে হাইপারটেনশানের চিকিৎসা কীভাবে করতে হবে?
১. স্ট্রোক হবার পেছনে অনেকগুলো ফ্যাক্টরকে দায়ী করা হয়। এরমধ্যে কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর আছে যা কোনোভাবে আর পরিবর্তন করা যায় না। যেমন বলা যাক, বয়সের কথা। বয়স বাড়লে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। কেউ বয়স বাড়াকে থামিয়ে রাখতে পারে না। আবার কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর আছে যেগুলো চাইলে মডিফাই করা সম্ভব। সকল স্টাডিতে হাইপারটেনশান বা উচ্চ রক্তচাপ সেই দৌড়ে একদম প্রথম স্থান অধিকার করে বসে আছে। যাদের স্ট্রোক হয় তাদের প্রায় ৬৪%-এর হাইপারটেনশান থাকে। ক্রনিক হাইপারটেনশানের কিছু টার্গেট অর্গান ড্যামেজ করে থাকে। ক্রনিক হাইপারটেনশানের মেজর এন্ড অর্গান টার্গেট হলো ব্রেইন।
যাদের হাইপারটেনশান আছে তাদের চারগুণ বেশি সম্ভাবনা স্ট্রোক হবার। ব্লাড প্রেশার যতো বেশি থাকবে স্ট্রোক হবার সম্ভাবনা ততো বেশি বাড়বে। সিস্টোলিক ব্লাড প্রেশার ১০ মিলিমিটার মার্কারি বাড়লে স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৮% বেড়ে যায়।
২. সহজ করে বললে তিন ধরনের স্ট্রোক আছে। ইশকেমিক স্ট্রোক, ইন্ট্রাসেরেব্রাল হেমোরেজ ও সাবএরাকনয়েড হেমোরেজ। এই তিন ধরনের শতকরা হার কমবেশি যথাক্রমে ৮৭%, ১০% ও ৩%। ইন্ট্রাসেরেব্রাল হেমোরেজ যদি ৫ জনের হয়, তার মধ্যে ৪ জনেরই হাইপারটেনশান থাকে।
প্রতি বছর ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। তার মধ্যে ৫০ লাখ মানুষ সুস্থ হয়, ৫০ লাখ মারা যায় এবং ৫০ লাখ স্থায়ীভাবে অক্ষম ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
বাংলাদেশে স্ট্রোকের প্রিভেলেন্স প্রতি হাজার পপুলেশনে ১১.৩৯। সংখ্যাটা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়।
তবে একটা আশার বিষয় আছে। হাইপারটেনশান প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসার মাধ্যমে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
৩. স্ট্রোকের সঙ্গে সিস্টোলিক ব্লাড প্রেশারের সম্পর্ক বেশি না-কি ডায়াস্টোলিকের? উত্তর, সিস্টোলিক বিপি। সিস্টোলিক বিপি স্ট্রোকের বেটার প্রেডিক্টর। এশিয়ার জনগণের ওপর স্টাডি করে দেখা গেছে, ১০ মিলিমিটার মার্কারি সিস্টোলিক বিপি কমলে স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৪১% কমে।
৪. স্ট্রোকের রোগীদের হাইপারটেনশান ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। ইশকেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে, বিপি যদি বেশি কমিয়ে ফেলা হয় আশেপাশের কোল্যাটারালসে হঠাত করে সার্কুলেশান যায় কমে। ফলে ইশকেমিক কোর এক্সপানশানের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এটা এতোটাই বিপজ্জনক হতে পারে যে, এর কনসিকোয়েন্স মৃত্যুতে গিয়ে ঠেকে। আবার বিপি যদি পর্যাপ্ত না কমানো হয়, তাহলে হেমোরেজিক ট্রান্সফর্মেশানের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এ যেন দোধারী তলোয়ার।
একটা খুব কঠিন কথা সহজ করে বলার চেষ্টা করা যাক। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে মূলত সেরেব্রাল পারফিউশান প্রেশার মেইনটেইন করতে হয়। কতো? ৬০-৯০ মিমি মার্কারি। এখন সেরেব্রাল পারফিউশান প্রেশার বের করতে লাগে আবার ইন্ট্রাক্রেনিয়াল প্রেশার। মুশকিলের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্ট্রাক্রেনিয়াল প্রেশার বের করার জন্য ট্রান্সক্রেনিয়াল ডপলার করা প্রায় অসাধ্য কাজ। তো কী করা যাবে এখন?
আমরা সহজে যেটা করতে পারি তা হলো মিন আর্টারিয়াল প্রেশার (সারোগেট মার্কার) বের করা। গাইডলাইনগুলো বলছে, টার্গেট সেরেব্রাল পারফিউশান প্রেশার যদি মেইনটেইন করতে হয়, তবে মিন আর্টারিয়াল প্রেশার ৮০ মিমি মার্কারির উপরে থাকা লাগবেই। যদি এটা নিশ্চিত করা যায়, সেরেব্রাল পারফিউশান প্রেশার তার নরমাল রেঞ্জে থাকবে। ট্রিটমেন্টের আউটকাম বেশ ভালো হবার সম্ভাবনা থাকবে।
মিন আর্টারিয়াল প্রেশার কীভাবে বের করে? ডায়াস্টোলিক বিপকে ২ দিয়ে গুণ যোগফল যা আসে, তার সঙ্গে সিস্টোলিক বিপি যোগ করব। এবার যোগফল যা আসে তাকে ৩ দিয়ে ভাগ করলেই মিন আর্টারিয়াল প্রেশার বেরিয়ে আসবে। অন্য ইকুয়েশানও আছে।
৫. স্ট্রোকের ম্যানেজমেন্ট অনেকাংশে নির্ভর করে রোগীর স্ট্রোকের ডিউরেশান কতোক্ষণ তার ওপর। এর উপর ভিত্তি করে চিকিৎসায় পার্থক্য হবে। স্ট্রোক একা থাকে না সাধারণত, তার সঙ্গে আরও বেশ কিছু কোমরবিডিটি থাকতে পারে। ঐ কোমরবিডিটির উপরেও চিকিৎসার ধরন নানামুখী হয়।
ইয়াং রোগী যদি স্ট্রোক নিয়ে আসে, তিনটি বিষয় আলাদা করে ভাবতে হবে। তিনি ড্রাগ এবিউজার নন তো? তার কি কোনো কোয়াগুলোপ্যাথি আছে? তিনি কি এন্টিকোয়াগুলেন্ট জাতীয় ওষুধ খান?
৬. আমাদের কাছে ইশকেমিক স্ট্রোকের একজন পেশেন্ট এলেন। বিপি ২০০/১১০ মিমি মার্কারি। বিপি কি কমাব?
এই উত্তর এক কথায় দিয়ে দেওয়া যায় না।
এই পেশেন্টকে নিয়ে আমাদের কী প্ল্যান সেটি আগে ঠিক করতে হবে।
-এই পেশেন্ট কি সিম্পটম অনসেটের ৪.৫ ঘন্টার মধ্যে এসেছে? তাকে কি আমরা ইন্ট্রাভেনাস ফিব্রিনোলাইটিক থেরাপি দেবার প্ল্যান করছি?
-এই পেশেন্টকে কি আমরা মেকানিকাল থ্রম্বেকটমি করার প্ল্যান করছি?
-এর সঙ্গে কি আবার ফিব্রিনোলাইসিস করব?
-নাকি এসবের কিছুই করার মতো সিচুয়েশন নেই?
৭. ASA/ACC রিকমেন্ড করছে, যদি ইন্ট্রাভেনাস ফিব্রিনোলাইটিক থেরাপি দিতে চাই, তবে ব্লাড প্রেশার ১৮৫/১১০ মিমি মার্কারির নিচে রাখতে হবে। অর্থাৎ উক্ত রোগীর (২০০/১১০) ব্লাড প্রেশার আমরা কমাব। যদি পেশেন্ট আমাদের কাছে এই ব্লাড প্রেশারের কম নিয়ে আসে তাহলে আর বিপি কমানোর প্রয়োজন নেই।
ফিব্রিনোলাইসিস করার পর পরবর্তী ২৪ ঘন্টা বিপি কেমন রাখতে হবে? ৫ করে বাদ দিই। ১৮০/১০৫ মিমি মার্কারির নিচে। এগুলো ক্লাস ওয়ান রিকমেন্ডেশান। মানতে হবে।
৮. ধরা যাক, পেশেন্টের মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি করা হবে। তাহলে উক্ত রোগীর (২০০/১১০) বিপি কি কমাতে হবে? হ্যাঁ। কতো রাখতে হবে? আগের পয়েন্টের মতোই। <১৮৫/১১০ মিমি মার্কারি। পরবর্তী ২৪ ঘন্টা? <১৮০/১০৫ মিমি মার্কারি।
৯. এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথায়। যদি এই দুটোর কোনোটার জন্যই তিনি কোয়ালিফাইড না হন, তবে উক্ত রোগীর (২০০/১১০) বিপি কি আমরা কমাব?
উত্তর : না।
এক্ষেত্রে ২২০/১২০ মিমি মার্কারির বেশি যদি বিপি না হয়ে থাকে, তবে প্রথম ৪৮-৭২ ঘন্টায় বিপি কমানো ‘উচিত নয়’ এক্ষেত্রে।
তবে এই কথা কি সবার জন্য প্রযোজ্য? সবার জন্য প্রযোজ্য না আসলে। খুব বেশি মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের ট্রিটমেন্ট ইন্ডিভিজুয়ালাইজড।
এখন কারও যদি একিউট ইশকেমিক স্ট্রোকের সঙ্গে একিউট হার্ট ফেইলিওর কিংবা এওর্টিক ডিসেকশান কিংবা একিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশান কিংবা প্রিএকলাম্পশিয়া/একলাম্পশিয়া থাকে? সেক্ষেত্রে তো বিপি কমাতেই হবে। এখানে একটা ইন্ট্রেস্টিং বিষয়। এসব কন্ডিশনে বিপি ম্যানেজ করতে হবে এই কন্ডিশনগুলোর গাইডলাইন অনুযায়ী। স্ট্রোকের গাইডলাইন অনুযায়ী নয়।
১০. গুরুত্বপূর্ণ কথা। কোনো পেশেন্টের উপরোক্ত কোনো কন্ডিশান নেই যেখানে দ্রুত বিপি কমানোর প্রয়োজন। যেটাই হয়তো আমরা বেশিরভাগ পাই।
সেক্ষেত্রে বিপি যদি >২২০/১২০ মিমি মার্কারি হয়, তবে বেজলাইন থেকে ১৫% বিপি কমানো যেতে পারে। (এখানেও নানামত আছে। বেশি জটিল হবার আশঙ্কায় এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।)
……..
উফ কী এক কঠিন অবস্থা! ইশকেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে বিপি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আরও কিছু কথা বলতে হবে। হেমোরেজিক তো রয়েছেই। তবে এই পর্ব ইতোমধ্যে বিশালাকার ধারণ করেছে। তাই পরবর্তী পর্বসমূহে।
Raiyyan Tahsan Date:-24-08-2025 Sunday Time:-09-53-25 Pm